কার স্বার্থে পূর্ত মন্ত্রণালয়ে নিষ্কণ্টক জমির তালিকা
লিটন আলী
আপলোড সময় :
০৪-০৮-২০২৬ ০৬:০৫:২৮ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৪-০৮-২০২৬ ০৬:০৫:২৮ অপরাহ্ন
রাজধানীসহ দেশের বিভাগীয় শহরে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন বিপুলসংখ্যক প্লট রয়েছে। এরমধ্যে কিছু প্লট হাতিয়ে নিতে তৎপর রয়েছে একটি স্বার্থান্বেষী মহল। যুগের পর যুগ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর ঘুরে কাঙ্ক্ষিত সুবিধা করতে না পারলেও সম্প্রতি নতুন কৌশলে সফল হয়েছে তারা। অভিযোগ রয়েছে, সেই কৌশলের অংশ হিসেবে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সদ্যবিদায়ী সচিব মো. নজরুল ইসলাম অভিনব ‘নিষ্কণ্টক তালিকা’ হাজির করেন। আর এই তালিকা তৈরিতে মন্ত্রণালয়ের কতিপয় কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেট কাজ করেছে বলে জানা যায়।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, কোনো দৃশ্যমান নীতিগত সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক সংস্কার কিংবা আদালতের নির্দেশনা ছাড়াই হঠাৎ করে দেশের বিভিন্ন সরকারি আবাসন প্রকল্পের বিপুলসংখ্যক প্লট ও ফ্ল্যাটকে ‘নিষ্কণ্টক’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ধাপে ধাপে প্রকাশ করা হয়েছে গেজেটও। কিন্তু কেন এই তালিকা করা হচ্ছে, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আর এ নিয়েই দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। তথাকথিত এই নিষ্কণ্টক তালিকায় ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ অন্যান্য জেলার মিলিয়ে প্রায় ৩৮ হাজার ১৮৪টি প্লট, ফ্ল্যাট ও বাড়ি রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবেই বিতর্কিত ও মূল্যবান সরকারি প্লটগুলো নিষ্কণ্টক দেখিয়ে একটি স্বার্থান্বেষী মহলকে সুবিধা করে দেওয়া হচ্ছে। যেসব প্লট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মালিকানা বিরোধ, একাধিক দাবিদার কিংবা প্রশাসনিক জটিলতা রয়েছে, সেগুলোর একটি অংশও এই তালিকায় স্থান পাচ্ছে। পরে সেসব প্লট ছাড়িয়ে ব্যক্তি মালিকানায় নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এর আগে, সাবেক সচিব মো. নজরুল ইসলাম রাজধানীর ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ২২ নম্বর সড়কের (নতুন ১২/এ) প্রায় ১০০ কোটি টাকা মূল্যের ২৫২ নম্বর (নতুন ৭১) প্লটটি কায়দা করে ব্যক্তি মালিকানায় দিয়ে দেন। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে গেজেট বাতিল করতে বাধ্য হন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রথম ধাপে শুধু খিলগাঁও পুনর্বাসন এলাকার ১ হাজার ৩০টি প্লটকে নিষ্কণ্টক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরপর দ্বিতীয় ধাপে খিলগাঁওয়ের আরও ৬৯৯টি এবং রাজারবাগ ও বাসাবো ওহাব কলোনির ১৯৮টি প্লট যুক্ত করা হয়। তৃতীয় ধাপে খিলগাঁওয়ের ৩৬৪টি এবং রাজারবাগ ও বাসাবো ওহাব কলোনির ২০৫টি প্লট তালিকাভুক্ত হয়। সর্বশেষ চতুর্থ ধাপে খিলগাঁওয়ের আরও ১৪৪টি এবং রাজারবাগ ও বাসাবো ওহাব কলোনির ১৩৪টি প্লট যুক্ত করা হয়েছে। অল্প সময়ের ব্যবধানে একই এলাকার এত বিপুলসংখ্যক প্লটকে ধাপে ধাপে নিষ্কণ্টক হিসেবে গেজেটভুক্ত করার কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, তালিকায় শুধু প্রকৃত নিষ্কণ্টক প্লটই নয়, দীর্ঘদিন ধরে বিরোধপূর্ণ অনেক প্লটও স্থান পেয়েছে। বিশেষ করে যেসব প্লটের ক্ষেত্রে একাধিক ব্যক্তি মালিকানা দাবি করছেন, আদালতে মামলা রয়েছে অথবা প্রশাসনিক জটিলতায় বরাদ্দ কার্যক্রম আটকে আছে এমন কিছু প্লটও তালিকাভুক্ত হয়েছে। এসব প্লট নিষ্কণ্টক হিসেবে গেজেটভুক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সুবিধাভোগীরা সেগুলো নিজেদের নামে ছাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
সূত্রগুলোর দাবি, তালিকাভুক্ত প্লটগুলোর মধ্যে সরকারের অত্যন্ত মূল্যবান অনেক প্লট রয়েছে। এসব প্লটের কিছু অংশ ইতোমধ্যে ব্যক্তি মালিকানায় চলে গেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। একই ধরনের প্রক্রিয়ায় ঢাকার বাইরেও, বিশেষ করে চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত কিংবা বিরোধপূর্ণ সরকারি প্লটকে নিষ্কণ্টক তালিকাভুক্ত করে হস্তান্তরের ঘটনাও ঘটেছে।
মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত একাধিক গেজেট পর্যালোচনায় দেখা যায়, নিষ্কণ্টক তালিকার পরিধি শুধু খিলগাঁও কিংবা রাজারবাগ ও বাসাবো ওহাব কলোনিতে সীমাবদ্ধ নয়। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আওতাধীন রাজধানীর প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক প্রকল্পের বিপুলসংখ্যক প্লট ও ফ্ল্যাটও ধাপে ধাপে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
গেজেট অনুযায়ী, বনানী আবাসিক এলাকার ৫৭৪টি প্লট, গুলশান আবাসিক এলাকার ১ হাজার ১৬১টি প্লট, উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের (সেক্টর-১৮) ২ হাজার ৫১টি ফ্ল্যাট, উত্তরা আবাসিক এলাকার ৬ হাজার ৬০৭টি প্লট, উত্তরা (তৃতীয় পর্ব) আবাসিক এলাকার (সেক্টর-১৫, ১৬, ১৭) ৫ হাজার ২৮১টি প্লট, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ৫৯৬টি প্লট, নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকার ৬৩৪টি প্লট, শ্যামপুর পুনর্বাসন এলাকার ১৪৯টি প্লট, ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্পের ১ হাজার ১২টি প্লট এবং পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের বিভিন্ন সেক্টরের ৯ হাজার ৫০৪টি প্লট গেজেটভুক্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) আওতাধীন লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর ও মিরপুরের বিভিন্ন সরকারি ফ্ল্যাট প্রকল্পের ৭৩৯টি ফ্ল্যাট, মিরপুরের রূপনগর সম্প্রসারিত আবাসিক এলাকার ১৫৩টি প্লট, মিরপুর-১ নম্বর সেকশনের ৪৫টি বাড়ি এবং হাউজিং এস্টেটের ৪৩০টি প্লটও নিষ্কণ্টক তালিকায় স্থান পেয়েছে।
ঢাকার বাইরেও একই প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন জেলার সরকারি আবাসন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে– সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, গোপালগঞ্জ এবং মাগুরা জেলা শহরে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের লোকদের জন্য আবাসিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্য থেকে ২২৮টি প্লট। পাশাপাশি নড়াইল, ঝালকাঠি, পিরোজপুর ও শরীয়তপুরের সাইট অ্যান্ড সার্ভিসেস আবাসিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্পের ১৯২টি প্লট, টাঙ্গাইল হাউজিং এস্টেটের ১৬৭টি প্লট, রাজশাহীর তেরখাদিয়া হাউজিং এস্টেটের ১১৩টি প্লট, যশোর হাউজিং এস্টেটের ৬টি প্লট এবং খুলনা ফুলতলা প্লট প্রকল্পের ৪টি প্লটও গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
চট্টগ্রামেও একই ধরনের বিপুলসংখ্যক সরকারি সম্পত্তি নিষ্কণ্টক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাউজান পিংক সিটি-১ ও ২-এর ১০১টি প্লট, আগ্রাবাদ আবাসিক এলাকার ২৮৫টি প্লট, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার ৩৬টি প্লট, ষোলশহর পুনর্বাসন এলাকার ৪টি প্লট, হালিশহর হাউজিং এস্টেটের ৫৩টি বাড়ি এবং বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্পের ৪৮টি ফ্ল্যাট।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের ১০৮টি প্লট, অন্যান্য আবাসিক এলাকার ১ হাজার ৫৫৭টি প্লট, কল্পলোক আবাসিক এলাকার প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের ১ হাজার ৬৩৭টি প্লট, ফৌজদারহাট, ষোলশহর ও হালিশহর পুনর্বাসন এলাকার ২৮৯টি প্লট, চন্দ্রিমা আবাসিক প্রকল্পের ১৩৯টি প্লট, কাতালগঞ্জ আবাসিক প্রকল্পের ৫৮টি প্লট, কর্ণফুলী আবাসিক প্রকল্পের ৪৮৪টি প্লট এবং সিলিমপুর আবাসিক এলাকার ৯৬৫টি প্লটও গেজেটভুক্ত করা হয়েছে।
এই বিষয়ে নগরবিদ স্থপতি ড. ইকবাল হাবিব বলেন, ‘গৃহায়ন মন্ত্রণালয় ও এর অধীন সংস্থাগুলো অধিকাংশ জমিই অধিগ্রহণ করা। উন্নয়নের পর এসব জমি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে বিক্রি করা হয়। এর সবকিছুই দালিলিক প্রমাণাদি দিয়ে নির্ধারিত। জনসাধারণের স্বার্থের বিঘ্ন ঘটিয়ে এই ধরনের নিষ্কণ্টক জমির তালিকা করা গুরুতর অন্যায় এবং রহস্যজনক। এটি কোনো মহলকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিষয়টিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’
সার্বিক বিষয়ে জানার জন্য সাবেক গণপূর্ত সচিব মো. নজরুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে তার ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে অভিযোগের বিষয়ে লিখে পাঠালেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো উত্তর দেননি।
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload
কমেন্ট বক্স